৪টি অফিসিয়াল পেনশন প্রোডাক্ট
- ১. প্রবাস স্কিম (NRB)
বিদেশে কর্মরত বা বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য। অবদান বা কিস্তি বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধ করতে হয়।
- ২. প্রগতি স্কিম (Private Employees)
বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক, বীমা কোম্পানি, এনজিও, বা যেকোনো অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মীদের জন্য।
- ৩. সুরক্ষা স্কিম (Self-Employed)
অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত পেশাজীবী, যেমন—কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক, কামার-কুমার, বা স্বনির্ভর যেকোনো ব্যক্তির জন্য।
- ৪. সমতা স্কিম (Ultra-Poor)
দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী অতি-দরিদ্র নাগরিকদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বলয়। অবদানের অর্ধেক টাকা সরকার প্রদান করে।
কারা আবেদনের যোগ্য?
১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিক সর্বজনীন পেনশন স্কিমে নিবন্ধন করতে পারবেন। বিশেষ বিবেচনায় ৫০ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকরাও স্কিমে অংশ নিতে পারবেন, তবে তাদের ক্ষেত্রে অবসরে আজীবন পেনশন সুবিধা পেতে ন্যূনতম ১০ বছর একটানা কিস্তি পরিশোধ করতে হবে।
যাঁদের নিয়মিত বেতন বা সরকারি পেনশনের ব্যবস্থা নেই, বিশেষ করে গৃহিণী, স্বনির্ভর পেশাজীবী, প্রবাসী শ্রমিক ও বেসরকারি চাকরিজীবীরা এই কর্মসূচিতে সর্বাধিক উপকৃত হবেন। এই জাতীয় অ্যাকাউন্টের বড় সুবিধা হলো চাকরি পরিবর্তন বা বাসস্থান পরিবর্তন করলেও আপনার জমানো অর্থ ও অ্যাকাউন্ট সুরক্ষিত থাকে।
অবদান কীভাবে কাজ করে
অ্যাকাউন্ট খোলার সময় আপনার অর্থনৈতিক সামর্থ্য অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট মাসিক কিস্তির পরিমাণ বা স্তর নির্বাচন করতে হবে। কিস্তির অর্থ মাসিক, ত্রৈমাসিক বা বাৎসরিক ভিত্তিতে জমা দেওয়া যায়। জমানো অর্থ জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ নিরাপদ সরকারি ট্রেজারি বন্ড ও লাভজনক সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ করে থাকে।
আপনার মূল অবদান, বিনিয়োগের সঞ্চিত লভ্যাংশ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সরকারি সহ-অবদান (সমতা স্কিমের জন্য) একত্রিত হয়ে একটি পেনশন তহবিল তৈরি করে। বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর এই সামগ্রিক ফান্ডের ওপর ভিত্তি করে আপনাকে আজীবন প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ পেনশন লভ্যাংশ দেওয়া শুরু হবে।
বাস্তব উদাহরণ: সমতা বনাম প্রগতি স্কিম
উদাহরণ ক (সমতা স্কিম): একজন অতি-দরিদ্র নাগরিক প্রতি মাসে ৫০০ টাকা জমা করছেন। সরকার তাঁর জন্য অতিরিক্ত ৫০০ টাকা সহ-অবদান হিসেবে প্রদান করে। ৩০ বছরে মোট অবদান দাঁড়ায় ৩,৬০,০০০ টাকা। চক্রবৃদ্ধি রিটার্ন ও সরকারি অনুদান সহ ৬০ বছর বয়সের পর এটি আজীবন প্রতি মাসে আকর্ষণীয় লভ্যাংশে রূপান্তরিত হবে।
উদাহরণ খ (প্রগতি স্কিম): একজন বেসরকারি চাকরিজীবী প্রতি মাসে ২,০০০ টাকা জমা করেন। ২৫ বছর মেয়াদে তাঁর নিজস্ব জমাকৃত অর্থ দাঁড়ায় ৬,০০,০০০ টাকা। যদি চক্রবৃদ্ধি মুনাফার হার গড়ে ৮% ধরা হয়, তবে মেয়াদপূর্তিতে মোট ফান্ডের মূল্য হবে প্রায় ১৯ লক্ষ টাকা, যা তাঁকে ৬০ বছর বয়স থেকে প্রতি মাসে আনুমানিক ১১,০০০ টাকার আজীবন পেনশনের সুবিধা দেবে।
নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস
পেনশন নিবন্ধন সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় সম্পাদিত হয়। আগ্রহী আবেদনকারীরা ঘরে বসেই অফিশিয়াল ইউ-পেনশন পোর্টাল (UPension Portal) থেকে অথবা যেকোনো তফসিলি ব্যাংক (যেমন—সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক ও সিটি ব্যাংক)-এর শাখায় গিয়ে সরাসরি নিবন্ধন সম্পন্ন করতে পারবেন। প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস:
- আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) (প্রবাস স্কিমের ক্ষেত্রে পাসপোর্ট বা জন্মনিবন্ধন সনদ)।
- আবেদনকারীর সাম্প্রতিক পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি।
- মনোনীত নমিনির জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি।
- আবেদনকারীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর, রাউটিং নম্বর ও ব্যাংকের শাখার নাম (অটো-ডেবিটের মাধ্যমে কিস্তি কাটার জন্য)।
- আবেদনকারীর NID এর সাথে সরাসরি লিংক করা সচল মোবাইল নম্বর।
সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির মূল সুবিধাসমূহ
- রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি: সম্পূর্ণ বাংলাদেশ সরকার দ্বারা পরিচালিত ও গ্যারান্টিযুক্ত, যার ফলে তহবিল খোয়ানোর কোনো ঝুঁকি নেই।
- আজীবন পেনশন সুবিধা: বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর আজীবন নিয়মিত মাসিক আয়ের নিশ্চয়তা।
- নমিনির নিরাপত্তা: পেনশনভোগী যদি ৭৫ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে মারা যান, তবে মনোনীত নমিনি অবশিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত (পেনশনভোগীর বয়স ৭৫ বছর হওয়া পর্যন্ত) প্রতি মাসে পেনশন পাবেন।
- কর রেয়াত সুবিধা: স্কিমে প্রদত্ত মাসিক কিস্তির অর্থ আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় বিনিয়োগ কর রেয়াতের জন্য যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা ও বিবেচনা
- অর্থ অফেরতযোগ্য: অত্যন্ত জরুরি চিকিৎসা বা বিশেষ পরিস্থিতি ব্যতীত, ন্যূনতম ১০ বছরের অবদান সম্পন্ন হওয়ার আগে পেনশন তহবিলের মূল অর্থ কোনোভাবেই উত্তোলন করা যাবে না।
- বকেয়ার ওপর জরিমানা: নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কিস্তি দিতে ব্যর্থ হলে নিয়ম অনুযায়ী লভ্যাংশের ওপর বিলম্ব ফি আরোপ করা হবে।
- লভ্যাংশ সমন্বয়: সময়ের সাথে সাথে পেনশন বিনিয়োগ তহবিলের অর্জিত মুনাফার ওপর ভিত্তি করে লভ্যাংশ পুনঃনির্ধারণ হতে পারে।
জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ): সর্বজনীন পেনশন স্কিম
সর্বজনীন পেনশন স্কিমে আবেদনের বয়স কত?▼
যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিক যাঁদের বয়স ১৮ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে, তাঁরা আবেদন করতে পারবেন। তবে বিশেষ প্রবিধানের আওতায় ৫০ বছরের বেশি বয়সীরাও অংশ নিতে পারেন, তবে তাঁদের একটানা ন্যূনতম ১০ বছর কিস্তি পরিশোধ করতে হবে।
আমি কি মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে পেনশন অ্যাকাউন্ট বাতিল করে টাকা তুলতে পারব?▼
না, দীর্ঘমেয়াদী বার্ধক্য সুরক্ষার স্বার্থে মেয়াদপূর্তির আগে পুরো টাকা তোলার সুযোগ নেই। তবে আপনি বিশেষ প্রয়োজনে জমাকৃত ফান্ডের সর্বোচ্চ ৫০% পর্যন্ত লোন নিতে পারবেন এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে তা ফেরত দিতে হবে।
পেনশনভোগীর মৃত্যু হলে নমিনি কী সুবিধা পাবেন?▼
পেনশনভোগী যদি অবসরে যাওয়ার পর ৭৫ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে মৃত্যুবরণ করেন, তবে মনোনীত নমিনি অবশিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত (পেনশনভোগীর সম্ভাব্য ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত) পেনশন পাবেন। এছাড়া ৬০ বছর বয়স হওয়ার আগে মারা গেলে নমিনি লাভসহ সম্পূর্ণ জমাকৃত ফান্ড ফেরত পাবেন।
সম্পর্কিত অর্থসংক্রান্ত নির্দেশিকাসমূহ
আপনার অবসর পরিকল্পনা সুদৃঢ় করুন। এই নির্দেশিকার পাশাপাশি আমাদের অন্যান্য টুলস যেমন— অবসর প্ল্যানার, সঞ্চয়পত্র ক্যালকুলেটর, ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক এবং সরকারি ট্রেজারি বন্ড-এর গাইডগুলো মিলিয়ে সেরা সিদ্ধান্ত নিন।